১ম আর ২য় পর্বের পর শেষ পর্বটা লিখে গুছিয়ে উঠতে একটু সময়ই নিলাম। আল্লাহ আমাকে কিছু নিদর্শন দেখাবেন বা জানাবেন বলেই হয় তো আমার এই সময় নেওয়া। গতপরশু রাতেই আমরা যেখানে থাকি তার পাশের বস্তি থেকে কান্না আর হাহুতাশের শব্দ ভেসে আসছিল, ফজরের নামাযের যাওয়ার সময় আমাদের বিল্ডিংয়ের পাশের মাঠে দেখলাম একটা লাশ দাফনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এরপর সকালের দিকে পেলাম আরেকটি খবর- আমার খুব কাছের এক বন্ধুর বাবা গত মাসে রোজা শুরু হওয়ার কিছু দিনের মাথায়ই স্ট্রোক করেছেন, এখন চিকিৎসাধীন। এরো কয়েকদিন আগে এক আঙ্কেলের কাছ থেকে জানালেন তিনি ডিহাইড্রেশন আর এরপর অ্যানাফাইলাক্টিক শকে যাওয়ার কারনে রোজা রাখতে পারছেন না বেশ কিছুদিন ধরে। (আল্লাহ তাদেরকে সুস্থ্য করে তুলুন, আমীন) এই তিনটি ঘটনায় আমার চিন্তা আসল, আমি কি ইনশাআল্লাহ সুস্থ্য ও সবল থেকে এই রমাদানের সকল রোজা শেষ পর্যন্ত করতে পারব তো? আগামী রমাদান কি পাব? আল্লাহু আ’লাম! আল্লাহ আমাদের সকলকেই সেই সামর্থ দান করুন
কর্মক্ষেত্র বা স্কুল-কলেজ ভার্সিটি থেকে আসার পথে ঢাকা শহর বা জ্যামযুক্ত শহরের বদৌলতে জ্যামের মধ্যে যে অলস সময় পাওয়া যায়, তার এই সময়টুকু কোন সুরার তিলাওয়াত/ তাফসীর/ মুখস্থ করার জন্য শুনতে শুনতে আসতে পারা যায়। বাসায় আসার পর স্বাভাবিক ভাবেই নেতিয়ে পড়ে শরীরটা। রিফ্রেশ হয়ে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে ইফতারের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতে হবে।
ইফতারের আগের সময়টা খুবই একটা তাৎপর্যপূর্ন সময় বটে। যে কয়টা সময়ে আল্লাহ দুয়া কবুল করার জন্য এগিয়ে আসেন এই সময়টা তার মধ্যে একটা। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই দেখা যায় ইফতারের যোগার আর ব্যবস্থা করতে করতে এই সময়টা হারিয়ে ফেলি। আবার এক সাথে যখন অনেকে হোস্টেল/ হল/ মেসে ইফতারে বসেন তখন ইফতারের আগ পর্যন্ত দেখা যায় আড্ডা আর কথাবার্তায় শেষের দারুন এই সময়টা হারিয়ে যায়। একটু সতর্ক হলেই আমরা কিন্তু এই সুযোগটা লুফে নিতে পারি। শুধু কি দুয়া করে আল্লাহর কাছে চাওয়া, সেই সাথে এমন কোন জানা গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাফ চাওয়া, আমার যেই সকল নামায/ ইবাদত কবুল হওয়ার ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে সেগুলোর ব্যাপারেও কিন্তু আল্লাহর কাছে চেয়ে কবুলিয়াত আদায় করে নিতে পারি ইফতারির আগ মুহুর্তে!
ইফতারের সময়, মাশাআল্লাহ! খেজুর বা শরবত যাই দিয়ে সুন্নত অনুসারে শুরু করি না কেন খাদ্য যে আল্লাহর কত বড় নিয়ামত বুঝা যায় ঠিক সেই সময়ে! সুবাহানাল্লহি ওয়াবিহামদিহি
কিন্তু এখানে আবার বিপত্তিও আছে! রমাদানের প্রথম দশক যেতে না যেতেই আমার আশে পাশের অধিকাংশ লোকজনকে দেখেছি এই পেটের বিপত্তিতে পড়তে। বিপত্তিটা ঘটে দুইটা উপায়ে- আপনার শান্ত থেকে অশান্ত থাকা স্টোমাকে একসাথে ভাজা পোড়া ঢেলে দিয়ে অ্যাসিডের অবিরাম দহনে জ্বালানী বাড়ানো- আসিডিটি আর অনেক্ষন ধরে কিছু না পাওয়া কিছুতে অনেক বোঝা চাপিয়ে তাকে বিগড়িয়ে দেওয়া- বদহজম। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, ভাজা পোড়া একেবারেই এড়িয়ে চলা আর একবারে সব গলধকরণ না করে ধীরে ধীরে সময় নিয়ে খাওয়া, আর বেশী বেশী বেশী করে পানি খাওয়া।

ছবির মত এমন যেন না হয়! মধ্যপ্রাচ্য সহ ইউকে তেও দেখেছি একটা ভালো পদ্ধতি, শুধু শরবত, পানি আর খেজুর দিয়ে ইফতারী সেরে মাগরীব শেষে রাতের নরমাল যা খেতে অভ্যস্থ তা খেয়ে নেওয়া। এতে তারাবীর আগেই পেট হালকা হয়ে যায় আর শরীরো ভালো থাকে।
তারাবীর আগে ভালো হয় যদি জেনে নিতে পারেন, আজ কোন সুরা পড়া হচ্ছে, কী বলা হয়েছে সূরাগুলোতে, আমাদের জন্য কি জানার আর মানার আছে। তাহলে ভালো মনযোগ আর মজাও আসবে তারাবী পড়তে। এই পেজের নোটগুলোতে ১৬ থেকে ৩০ পারার তারাবী অনুযায়ী সারাংশ দেওয়া আছে
তারাবী নিয়ে কথা বলতে গেলে ভয় হয় :s। কোথা থেকে কেউ এসে ৮ রাকাত না ২০, জামাতে না একাকী পরা যাবে এটা নিয়ে তর্ক লাগাবেন না প্লিজ! আট বা বিশ, জামায়াত বা একাকী সব ক্ষেত্রেই সহীহ ও হাসান হাদীস আছে, সবভাবেই আদায় করা যায়। আলহামদুলিল্লাহ, এই একমাসের তারাবী পড়তে পড়তে ক্বিয়ামুল লাইলের যে অভ্যাস হয়েছে তা ইচ্ছা করলেই তা আমরা সারা বছর অব্যাহত রাখতে পারি। উস্তাদ উমর সুলাইমান এই অভ্যাস আয়ত্ব করার একটা সুন্দর পদ্ধতির কথা বলেছেনঃ
"এটা অবশ্যই দারুন যে আপনি রমাদানের প্রতিদিন তারাবীহ মসজিদে আদায় করছেন। সাথে সাথে বাসায় যেয়েও একাকী কিছু অতিরিক্ত নামায যেন পড়েন এটাও নিশ্চিত করেন। রমাদান শেষে তারাবীহ পড়া বন্ধ হলেও আপনার সেই দুই রাকাত নামায এতে চলতেই থাকবে, ইনশাআল্লাহ"
আর সবার শেষে আল্লাহ রেখে দিয়েছেন রমাদান কেন, সারা বছরের মধ্যে সব থেকে দামী সময়টা, ক্বদরের রাত। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই রাতের জন্য কবুল করুন। ক্বদর কবে হবে তার সব থেকে ভালো উত্তর হলো "আল্লাহ জানেন", তাই আমিও রিস্ক নিব কেন! আর রমাদানের প্রতিটি রাতই বছরের অন্যসকল রাতের থেকে বেশী মূল্যবান। শুধু এক ২৭ এর দিকে তাকিয়ে না থেকে উচিৎ রমাদানের শেষের সকল বিজোড় রাতকে ক্বদর পাওয়ার জন্য কাজে লাগানো। এখন থেকেই পরিকল্পনা করুন কী কী করবেন সেই রাতগুলোতে, কতবেশী সময় বের করতে পারেন তার জন্য এখনই কাজ শুরু করুন।

হারাতে যেন না হয় এজন্য শায়খ নাভাইদ আযিযের পরামর্শটা দারুন লেগেছেঃ
"রমাদানের জন্য কয়েকটা দারুন কৌশলঃ১। এমন একটি গুনাহ/ খারাপ অভ্যাস (যা আপনি সচরাচর করেন) কে বেছে নিন, সম্পূর্ণ ত্যাগ করার জন্য২। আজ থেকে রমাদানের শেষ ১০ রাতের আগ পর্যন্ত ৫/ ১০ টাকা করে জমান৩। জমানো অর্থকে ১০ রাতের জন্য ভাগ করেন এবং আপনার ইচ্ছামত অভাবী মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিনএতে লাভঃ১। প্রায় ২১ দিন যথেষ্ট একটি খারাপ অভ্যাসকে ত্যাগ করার জন্য। আর সেই খারাপকে প্রতিস্থাপন করুন দানের অভ্যাস গড়ার মাধ্যমে২। একটি গুণাহ থেকে আপনি নিস্তার পেলেন৩। আর অবশ্যই, আপনি পেলেন সেই হাজার রাতের থেকেও শ্রেষ্ঠ রাত ''লাইলাতুল ক্বাদর", এবং তা দান করে মানুষকে সাহায্যের মাধ্যমেএই কথাটা ছড়িয়ে দিন সকলের মাঝে, আর তাদের অর্জিত সওয়াবের মালিক হোন তাদেরকে জানানোর মাধ্যমে..."( তিনি এটি প্রথম রমজানের আগের দিন শেয়ার করেছিলেন, আজ ১৪ রমজান, আছে আর ৬ দিন)
তবে দিন শেষে প্রতি রমাদানে আমাদের মনে হয় নিজেদের একটা খতিয়ান নিতে পারলে রমাদানের পরবর্তী দিনগুলোকে আরো ভালো করতে পারব ইনশাআল্লাহ। আমি কিছু প্রশ্ন শেয়ার করছি নিজেকে করার জন্য, আপনারাও যোগ করেন...
১। আমি নামাযে কী মনযোগ ও আন্তরিকতা বাড়াতে পেরেছি এই রমাদানে
২। রমাদান শুরুর আগের আমি আর এখনকার আমির মাঝে ইতিবাচক কোন পরিবর্তন করতে পেরেছি কি?
৩। আমার কুরআন তিলাওয়াত কি আমি আরো সহীহ শুদ্ধ করতে পারলাম?
৪। কুরআনের যে জ্ঞান আর তার প্রয়োগ রমাদানের আগে যা ছিল তার থেকে বাড়াতে পেরেছি কী? আরো কি বাড়াতে পারি না?
৫। আমার আচরণ, কথা আর লেনদেনে কী রমাদান শুরুর আগের থেকে উন্নত হয়েছে? কুরআন আর রাসূল (সা) সুন্নতময় কী হয়েছে?
৬। আজকে আমার রমাদান কেন্দ্রিক যে পরিকল্পনা ছিল, তার কতটুকু করতে পারলাম?
৭। যে গুনাহ বা খারাপ কাজে আমি অভ্যস্থ তা কী আমি ছেড়ে দিতে পারছি?
৮। আরো কী করতে পারি কাল থেকে যাতে আমার রমাদান আরো ভালো হতে পারে
৯। প্রতিটি কাজে কী আমার আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা কী রমাদান শুরুর আগের থেকে বাড়াতে পেরেছি?
১০। আল্লাহর প্রতি তাক্বওয়া/ ভয় কী আমার সকল চালচলন কাজে ও চিন্তায় অর্জিত হয়েছে, যার অর্জনই এ রমাদানের উদ্দেশ্য?
আর সর্বশেষ...
আমি কী আল্লাহর কাছে দাঁড়িয়ে এখনই জবাবদিহি করতে প্রস্তুত?
আজকের ছবিঃ প্রত্যেক রমজান শেষ হলেই মনে হয় কী যেন হয় নাই, আনাচান করে মন আবার কবে আসবে... েএকবার মনে আছে টিভীতে ঈদের চাঁদ দেখা গেছে ঘোষনা দেওয়ার পর চোখে পানি চলে এসেছিল। কতই না সুন্দর হয়ে যায় রমাদানে আমাদের পরিবেশ, আবার কোথায় যেন তা হারিয়ে যায়...

এই রমাদানের ভিডিওঃ রমাদান ও জীবন কেন্দ্রিক এমন কিছু ভিডিও লিঙ্ক দিচ্ছি যা আপনার মনকে নাড়া দিবে...
এই রমাদানে যা অর্জন করলাম আমরা তা আজীবন ধরে রাখার ও আরো উন্নতি করার প্রতিজ্ঞা করি। আল্লাহ আমাদের সকলের রমাদানকে পূর্ণ ও সফল করে তুলুন, আমাদের সকলকে সেই মঞ্জিলে মাকসুদ, জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছানোর জন্য যোগ্য করে তুলুন, কবুল করুন- এই রমাদানেই, আমীন। সকলের কাছে এই দুয়া চেয়ে শেষ করছি এই অধমের রমাদান সিরিজ

